ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি (Virtual Reality)

What is virtual reality?

ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি (Virtual Reality)

“বই আমাদেরকে কল্পনা করতে সাহায্য করে, এবং চলচিত্রে আমরা তা দেখতে পাই, কিন্তু VR (ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি) হচ্ছে সর্বপ্রথম মাধ্যম যা আমাদেরকে তা অনুভব করতে দেয়।” -নিক মোকি

শুধু বর্তমান প্রজন্মই নয় বরং গোটা দুনিয়াতে রাজত্ব করতে যাচ্ছে ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি এবং অগমেন্টেড রিয়্যালিটি। এই খাতের অপার সম্ভাবনা উপলদ্ধি করতে পেরে টেক জায়ান্টরা বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। যার ফলে ২০২০ সালের মধ্যে অগমেন্টেড রিয়্যালিটি এবং ভার্চুয়াল রিয়্যালিটির বাজার ১৫০ বিলিয়ন ইউএস ডলার হতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল ডাটা কর্পোরেশন (IDC) এর রিপোর্ট অনুযায়ী, সংখ্যাটি ১৬২ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। ২০১৭ সালে ১২ মিলিয়ন ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি হেডসেট বিক্রি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০১৮ সালে বিশ্বব্যাপী ২৪ মিলিয়ন অগমেন্টেড রিয়্যালিটি এবং ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি ডিভাইস বিক্রি হতে পারে। ২০১৬ সালে অন্তত ২৩০টি কোম্পানি ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি এবং অগমেন্টেড রিয়্যালিটি নিয়ে কাজ করেছে। গুগল, অ্যাপল, অ্যামাজন, ফেসবুক, মাইক্রোসফট, সনি এবং স্যামসং এর মত জায়ান্ট কোম্পানিগুলোর নিজস্ব AR/VR(অগমেন্টেড রিয়্যালিটি/ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি) টিম রয়েছে। ফেসবুক ২০১৪ সালে ২ বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে ওকুলাস ভিআর (Oculus VR) নামক ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি টেকনোলজি কোম্পানি কিনে নেয় এবং এখন ফেসবুকের ৪০০ জন কর্মচারী ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। ২০১৬ সালে HTC বের করে তাদের ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি হেডসেট HTC VIVE।

কিন্তু ঠিক কোন কারণে বড় বড় কোম্পানিগুলো এই খাতে বিলিয়ন ডলার খরচ করে যাচ্ছে?ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি এবং অগমেন্টেড রিয়্যালিটিতে বিপুল বিনিয়োগের অন্যতম কারণ হলো, এই খাতের বিপুল সম্ভাবনা। AR এবং VR শুধু গেমিং বা চিত্তবিনোদনের জন্যই নয় বরং শিক্ষাব্যবস্থা, ব্যবসা, চিকিৎসা এমনকি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যেও ব্যবহৃত হতে পারে।

ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি হলো, কম্পিউটারের মাধ্যমে সৃষ্ট কৃত্রিম বাস্তবতা বা রিয়্যালিটি। ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি হেডসেট ব্যবহার করে কম্পিউটার কৃত্রিম ছবি, সাউন্ড এবং অন্যান্য অনুভূতি সৃষ্টি করে। এই হেডসেট পরিধান করে আমরা ভার্চুয়াল রিয়্যালিটির জগতে প্রবেশ করতে পারব। আমাদের চারপাশের সকল কিছু চোখের সামনে ভেসে উঠবে এবং আমরা অনুভব করতে পারব কম্পিউটার দ্বারা সৃষ্ট নতুনজগত। ভার্চুয়াল রিয়্যালিটির সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো যে, আমরা শুধু এই নতুন জগত দেখতেই পারবো না বরং সেই সাথে তা স্পর্শ করতে পারবে, দীপ্যমান হবে, দৃশ্যমান হবে এবং অনুভূতির সাথে মিশে এক শিহরণ জাগাবে। এ এক অনন্য অবস্থা, আমরা প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পূর্ণ কাল্পনিক বা অদৃশ্য জগতের ছোঁয়া পাব যা কখনো কল্পনাই করা যেত না, তা এখন প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আমাদের ইন্দ্রিয়কে ছুঁয়ে যাচ্ছে। এ এক বিস্ময়কর নতুন জগত।

টেলিভিশনের সাথে ভার্চুয়াল রিয়্যালিটির পার্থক্য হচ্ছে যে, টেলিভিশনে শুধু নির্দিষ্ট স্ক্রিনেই আমরা ছবি দেখতে পারি, আর ভিআরে আমরা চারপাশে সকল দিকে দেখতে পারি। সেই সাথে নতুন সৃষ্ট এই জগতের বিভিন্ন বস্তুর সাথে আমরা যোগাযোগ বা Interact করতে পারি। টিভিতে শুধু পূর্বে রেকর্ড করা ছবিই দেখা যায় আর ভিআরে আমাদের নড়াচড়া বা কাজের ফলে দৃশ্যপটে পরিবর্তন আসতে পারে।

ভার্চুয়াল রিয়্যালিটিতে চারপাশের সম্পূর্ণ বাস্তবতা পাল্টে গেলেও অগমেন্টেড রিয়্যালিটিতে (AR) আমরা বাস্তব জগতের মাঝেই থাকি। তবে বাস্তব জগতের কিছু অংশ পাল্টে যায় এবং সেই নির্দিষ্ট অংশ বা অংশগুলোতে দেখা যায় কম্পিউটার সিমুলেটেড দৃশ্য। বিনোদন এবং ব্যবসাক্ষেত্রে অগমেন্টেড রিয়্যালিটি অধিক জনপ্রিয়তা লাভ করছে।

১৯৩৫ সালে স্ট্যানলি ওয়েনবাউমের সাইন্স ফিকশন উপন্যাস Pygmalion's Spectacles এ ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি উল্লেখ করা হয়। ১৯৬২ সালে মর্টন হেইলিগ তৈরি করেন “সেনসোরামা” (Sensorama) যার মাধ্যমে দর্শকরা ফিল্ম বা সিনেমা দেখার সময় ঘ্রাণ এবং অনুভব করতেও সক্ষম হবেন। বর্তমানে ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি এবং অগমেন্টেড রিয়্যালিটির জন্য ব্যবহার করা ডিভাইসগুলোর মাঝে অন্যতম হচ্ছে হেড মাইন্টেড ডিসপ্লে বা সংক্ষেপে HMD যা পরিধান করে দর্শকরা ভার্চুয়াল জগতে প্রবেশ করতে পারেন। ১৯৬৮ সালে সর্বপ্রথম HMD সিস্টেম তৈরি করেন আমেরিকান কম্পিউটার সাইন্টিস্ট ইভান সাদারল্যান্ড। ১৯৮০ এর দশকে “ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি” টার্মকে জনপ্রিয় করেন আমেরিকান কম্পিউটার সাইন্টিস্ট জ্যারন লেনিয়ার (Jaron Lanier)। লেনিয়ার ১৯৮৫ সালে VPL Research নামক একটি কোম্পানি গঠন করেন যেখানে ডাটা গ্লাভস, অডিও স্ফিয়ারের মত বিভিন্ন VR ডিভাইস তৈরি করা হয়েছে। ১৯৯০ সালে তৎকালীন বোইয়িং রিসার্চার টম কাউডেল “অগমেন্টেড রিয়্যালিটি” টার্ম ব্যবহার করেন। ১৯৯১ সালে শিকাগোর ইলেকট্রনিক ভিজুয়ালাইজেসন ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানীরা সর্বপ্রথম CAVE (Cave Automatic Virtual Environment) তৈরি করেন। একটি রুমের সাইজের সমান CAVE এর মাঝে দর্শকরা হেডসেট পরিধান করে ভার্চুয়াল রিয়্যালিটির অভিজ্ঞতা নিতে পারেন। ১৯৯১ সালে ভার্চুয়াল রিয়্যালিটিকে “টেকনোলজি অব দ্যা ইয়ার” বলে ঘোষণা করা হয়। ১৯৯৪ সালে জুলি মার্টিন সর্বপ্রথম অগমেন্টেড রিয়্যালিটি থিয়েটার প্রোডাকশন তৈরি করেন যার নাম “Dancing in Cyberspace”। ধীরে ধীরে কম্পিউটারের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে সাথে ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি এবং অগমেন্টেড রিয়্যালিটির ক্ষমতা বাড়তে থাকে। ১৯৯৯ সালে NASA X-38 spacecraft পরিচালনায় ব্যবহৃত করা হয় অগমেন্টেড রিয়্যালিটি। একই সালে আমেরিকার ন্যাভাল রিসার্চাররা Battlefield Augmented Reality System (BARS) নিয়ে কাজ শুরু করেন।

বর্তমানে ব্যবসা ক্ষেত্রেও ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি এবং অগমেন্টেড রিয়্যালিটি ব্যবহার করা হচ্ছে। ভোক্সওয়াগেন কোম্পানি তাদের কাস্টমারদের জন্য তৈরি করেছে The Volkswagen MARTA App যা অগমেন্টেড রিয়্যালিটি ব্যবহার করে গাড়ি মেরামত করায় সাহায্য করতে পারে। ২০১৪ সালে গুগল গ্লাস বের হয়। এটি চোখে পড়ার চশমার মত ওয়্যারেবল অগমেন্টেড রিয়্যালিটি গ্লাস। ২০১৬ সালে তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করে অগমেন্টেড রিয়্যালিটি মোবাইল গেম “পোকেমন গো” (Pokémon Go)। আইফোন এবং অ্যান্ড্রয়েড ফোনে এই গেম খেলা যায়।

অগমেন্টেড রিয়্যালিটির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে গুগোল গ্লাস এবং পোকেমন গো ব্যাপক অবদান রেখেছে। ২০১৪ সালে গুগোল গ্লাস বাজারে আসে। গুগোল গ্লাস মূলত হেড মাইন্টেড ডিসপ্লে (HMD) যা চশমার মত পরে যে কেউ অগমেন্টেড রিয়্যালিটি উপভোগ করতে পারবে। চশমার ডিসপ্লেতে স্মার্টফোনের মত তথ্য দেখা যাবে। ভয়েস কমান্ড বা কথা বলার মাধ্যমে গুগোল গ্লাস পরিধানকারী ইন্টারনেটে সংযুক্ত হতে পারবেন।

জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে গুগোল গ্লাসকেও হারিয়ে দিয়েছে “পোকেমন গো” নামক গেম। লোকেশন বেজড অগমেন্টেড রিয়্যালিটি ব্যবহার করে তৈরি করা এই গেম খেলার জন্য ব্যবহারকারীকে আশেপাশের বিভিন্ন এলাকায় হাঁটাহাঁটি করতে হবে, যার ফলে মোবাইল গেম খেলার সাথে সাথে হাঁটার ব্যায়ামটাও হয়ে যায়। গেমের ভেতরের চরিত্রকে হাটানোর জন্য ব্যবহারকারীকে মোবাইল নিয়ে হাঁটতে হবে। গেম খেলার সময় আমরা মোবাইল স্ক্রিনে দেখতে পাবো যে, আমাদের চারপাশের পরিবেশ কিছুটা পাল্টে গেছে এবং সেখানে বিভিন্ন পোকেমন, পোকেমন শপ এবং পোকেমন জিম
দেখা যাচ্ছে।



ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি এবং অগমেন্টেড রিয়্যালিটি বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হচ্ছে। কিছু উদাহরণ দেওয়া হলো:

১. শিক্ষা ব্যবস্থা: InteractiveEducation এর জন্য অগমেন্টেড রিয়্যালিটি ব্যবহার হচ্ছে উন্নত দেশগুলোতে। শিক্ষামূলক বেশ কিছু অ্যাপও ব্যবহৃত হচ্ছে। যেমন জ্যোতির্বিদ্যা শেখার জন্য তৈরি করা হয়েছে অগমেন্টেড রিয়্যালিটি বেজড অ্যাপ SkyView এবং AR Circuit অ্যাপ ব্যবহার করে সাধারণ সার্কিট তৈরি করা সম্ভব।

২. ব্যবসাক্ষেত্র: অগমেন্টেড রিয়্যালিটি ব্যবহার করে মার্কেটিং এর কাজ করছে বিভিন্ন কোম্পানি। L'Oreal Paris তৈরি করেছে “Makeup Genius” নামক অগমেন্টেড রিয়্যালিটি অ্যাপ। বুলগেরিয়ান কোম্পানি iGreet অগমেন্টেড রিয়্যালিটি অ্যাপ তৈরি করে যার মাধ্যমে Greeting Card তৈরি করে পরিচিতদেরকে পাঠানো যায়।

৩. ভিডিও গেম এবং বিনোদন: পোকেমন গো এর মত অগমেন্টেড রিয়্যালিটির গেমগুলো বেশ জনপ্রিয় হচ্ছে। ভার্চুয়াল রিয়্যালিটির মাধ্যমে প্লেস্টেশনে গেম খেলা যায়।

৪. ট্রেনিং: অগমেন্টেড রিয়্যালিটি আর ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি ব্যবহার করে সৈনিকরা এবং ডাক্তাররা তাদের অপারেশনের ট্রেনিং করতে পারেন।

৫. আর্কেয়োলজি: অগমেন্টেড রিয়্যালিটি ব্যবহার করে আবিষ্কৃত প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষের সম্পূর্ণ মডেল তৈরি করা সম্ভব যা আমাদের অতীত সম্পর্কে জানতে সাহায্য করবে।


 Facebook

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন